৬০ দশকে সেহরির আয়োজন কেমন ছিল

সেই প্রেক্ষিতে বলা যায়, রান্নাঘরসহ বাড়ির অন্যান্য যাবতীয় বেশ কিছু কাজ বাড়ির মহিলাদের একাই করতে হতো। সেই সময় রোজাগুলো ছিল শীতকালে। সে সময় গ্রামাঞ্চলে শীতের প্রকোপও ছিল।
গ্রামীণ জনপদে সে সময় এক একটি পরিবারের সদস্য সংখ্যা ছিল গড়ে প্রায় ৭/৮ জন। তার ওপর মধ্যবিত্ত পরিবারে থাকতো বাড়ির লজিং মাস্টার আর গড়ে ২/৩ জন কৃষি শ্রমিক। কোনো কোনো পরিবারে আরবি শিক্ষক বা মসজিদের ইমাম ও থাকতেন। সব মিলিয়ে গড়ে এক একটি পরিবারে মোট প্রায় ১৩/১৪ জনের জন্য সেহরি রান্না করতে হতো। মাঝে মাঝে বাড়ির মেয়েরা তাদের ছেলে-মেয়ে নিয়ে বাবার বাড়িতে নাইওর আসতো। সেই সময় গড়ে পরিবারের লোকসংখ্যা আরো বেড়ে যেতো।
ইফতারের পর রান্নাঘর গোছগাছ করে তখনকার গ্রামীণ মায়েরা মূল ঘরে চলে আসতেন। আদায় করে নিতেন মাগরিবের নামাজ। কিছুক্ষণ পর তারা আবারো ফিরে যেতেন রান্না ঘরে। এ সময় সবাই খেতে আসতেন রাতের খাবার। রাতের খাবার শেষ হওয়ার পর সেহরি রান্নার প্রাথমিক প্রস্তুতি সেরে মায়েরা আবারো ফিরে আসতেন শোবার ঘরে। এ সময় পড়ে নিতেন এশা আর তারাবির নামাজ। এর পর ঘরের বাকী টুকিটাকি কাজ সেরে মায়েরা ঘুমোতে যেতেন। উল্লেখ করা প্রয়োজন সেই সময় গ্রামাঞ্চলে প্রায় শতভাগ বাড়িই ছিল কাঁচা। বেড়া বা টিনের ফাঁক দিয়ে খুব সহজেই শীতের ঠান্ডা বাতাস ঘরে প্রবেশ করতো। গ্রামাঞ্চলে তখন বিদ্যুৎ না থাকায় ঘরে ঘরে কেরোসিনের হারিকেন আর কুপি বাতি ব্যবহার করা হতো। রান্না হতো লকড়ি দিয়ে মাটির চুলায়।
এবার আসি আমাদের মূল আলোচনায়। রাত প্রায় আটটা সাড়ে আটটা নাগাদ গ্রামাঞ্চলের সবাই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। ভোর রাতে আবার সবাইকে সেহরি খেতে উঠতে হবে। বাড়ির মায়েদের হাতে তখনো ছোটখাটো অনেক কাজ বাকি। রাতে সবার শেষে ঘুমাতে যেতেন মায়েরা। সে সময় ঠিক টাইম মতো সেহরি খেতে উঠা ছিল বেশ কঠিন এক ব্যাপার। অনেক বাড়িতেই কারো হাতঘড়ি বা টেবিল ঘড়ি ছিল না। কিছুটা অবস্থাপন্ন পরিবারে দেয়াল ঘড়ি দেখা যেত যে ঘড়ি প্রতি ঘণ্টায় ঘণ্টায় বেশ জোরে জোরে আওয়াজ করে সময়ের জানান দিতো। তবে বাস্তবে অনেকেই সেহরি খেতে উঠতেন অনেকটা আন্দাজের উপর নির্ভর করে। আর তাই অনেক সময় দেখা যেতো নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই অথবা খুব অল্প সময় হাতে থাকতে গ্রামের লোকজন সেহরি খেতে জেগে উঠতো।
গ্রামীণ জীবনে তখন শীতের গভীর রাত। চারদিকে সীমাহীন এক নির্জনতা। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন সমস্ত জনপদ। মূল ঘর থেকে বিচ্ছিন্ন বাঁশ, বেড়া আর ছন দিয়ে তৈরি রান্নাঘরে কেরোসিনের কুপি জ্বালিয়ে একাকী সেহরি রান্নায় ব্যস্ত আমাদের মায়েরা। অল্প কিছুক্ষণ নিদ্রা যাওয়ার কারণে মায়েদের চোখে তখনও রাজ্যের ঘুম। রাত দ্রুতই শেষ হয়ে আসছে। ১৪ /১৫ জনের রান্নার আয়োজন শেষ করতে হবে। ছোটদের অনেকেই সেহরি খেতে উঠবে না। তবে রান্না করা এ খাবার ওরা খাবে পরদিন সকালে। বাড়ির সবাই তখন লেপ, কম্বল আর কাঁথার নিচে গভীর ঘুমে। এদিকে বাড়ির মায়েরা তখন রান্নাঘরে প্রচণ্ড শীতে একাকী বসে বসে মাটির চুলায় লকড়ি দিয়ে সবার জন্য সেহরি প্রস্তুতে ব্যস্ত। মাঝে মাঝে লাকড়ি ভেজা থাকার কারণে চুলার আগুন কমে যেত। তখন চুলার আগুনের তেজ বাড়ানোর জন্য একটি বাঁশের চুঙ্গা দিয়ে মায়েরা জোরে জোরে চুলায় ফুঁ দিতেন। মাঝে মাঝে ক্রমাগত চুলায় ফুঁ দেওয়ার কারণে মায়েদের চোখ দুটো লাল হয়ে যেত। ব্যথা হতো চোখে। বাড়িতে শিশু বয়সী দুধের বাচ্চারা এই সময় মাঝে মাঝে ঘুম থেকে জেগে উঠে চিৎকার করে মা মা বলে কান্না জুড়ে দিতো। মায়েরা তখন আবার ছুটে যেতেন শোবার ঘরে। কোলে করে নিয়ে আসতেন শিশুদের। শিশুদের কোলে নিয়ে চাদর বা শাড়ি দিয়ে বুকে জড়িয়ে রেখে আবারো ব্যস্ত হয়ে পড়তেন সেহরি প্রস্তুতিতে। কাঁচা ঘরের ফাঁক দিয়ে হু হু করে রান্নাঘরে ঢুকতো শীতের বাতাস। আর এদিকে মায়েরা ছোট বাচ্চাকে কোলে নিয়ে প্রচণ্ড শীতের রাতে একাকী বসে বসে ঢুলু ঢুলু চোখে সবার জন্য সেহরি প্রস্তুতিতে ব্যস্ত।
এক সময় শেষ হতো রান্না। মায়েরা উঠে যেতেন রান্নাঘর থেকে। সবাইকে জাগিয়ে তুলতেন সেহরি খেতে। একে একে সবাই সেহরি খেতে আসতেন রান্নাঘরে। বসতেন পাটি বা পিঁড়িতে। মায়েরা তখন চুলার পাশে বসে সবাইকে খাওয়ানোর কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়তেন। এর ফাঁকে কোন এক সময় মায়েরা কাউকে দিয়ে কাছারি ঘরে থাকা বাড়ির কৃষি শ্রমিক, লজিং মাস্টার বা আরবি শিক্ষক/ইমামের জন্য ও খাবার পাঠিয়ে দিতেন।
ইতোমধ্যেই রাত প্রায় শেষ হয়ে আসছে। সবার খাওয়া পর্ব শেষ হলে সবশেষে খেতে বসতেন মায়েরা। অনেক সময় দেখা যেতো সবার শেষে খাওয়ার কারণে মায়েদের জন্য প্রয়োজনীয় পরিমাণ তরকারি ও অবশিষ্ট থাকতো না। তখন যা থাকে তা দিয়েই মায়েরা নিজেদের সেহরি সেরে নিতেন। এই সব কিছু শেষ করতে করতে রাত পেরিয়ে ভোর প্রায় সমাগত। আশেপাশের বাড়িগুলো থেকে শোনা যেত মোরগের ডাক। বাড়ির মোরগ গুলো ও তখন ডেকে উঠতো। জানান দিতো ভোর হতে আর বেশি বাকি নেই। অন্য সবাই খেয়েদেয়ে এরই মধ্যে আবারো ফিরে গেছেন যার যার জায়গায়। মায়েরা তখনো রান্নাঘরে। সবার খাওয়া দাওয়া শেষ হওয়ার পর রান্নাঘর গোছানো আর প্রয়োজনীয় ধোয়া মোছা সেরে পুকুর ঘাট থেকে ওজু করে মায়েদের ঘরে ফিরে আসতে আসতে মসজিদ থেকে ভেসে আসতো ফজরের নামাজের আযানের ধ্বনি।
এই পর্যায়ে আমাদের মায়েরা আদায় করে নিতেন ফজরের নামাজ। অনেকেই এরপর কিছুক্ষণ পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করতেন। ইতোমধ্যেই ধীরে ধীরে ফুটে উঠতো সকালের আলো। তখন ঘরের হারিকেন আর কুপি বাতিগুলো নিভিয়ে দিতেন মায়েরা। ক্লান্ত শরীরে তারা তখন গা এলিয়ে দিতেন বিছানায়। কে জানে কতক্ষণ হবে তাদের এই বিশ্রাম? হয়তো অল্প কিছুক্ষণ পরই আবারো তাঁদেরকে জেগে উঠতে হবে সংসারের অন্য কোন এক প্রয়োজনে।
তারাই আমাদের মা। এটাই বাংলাদেশের মায়েদের শাশ্বত রূপ। তাদের হাত ধরেই স্নেহ, মায়া, মমতা, আদর, যত্ন, ভালোবাসা আর সর্বোপরি সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের বিনিময়ে আজকে আমরা আমাদের জীবনের এই পর্যায়ে।

