হরমুজে চার দেশের জাহাজ চলাচলে ছাড় দিল ইরান

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ থেকে চার দেশের বাণিজ্যিক জাহাজকে ছাড় দিয়েছে ইরান। দেশগুলো হলো ভারত, চীন, ইরাক ও কাতার। তবে এই ছাড়ের অর্থ বিনা খরচে প্রণালি পার হওয়ার সুযোগ নয়। ভারত ও চীনের জাহাজকে এখনো পারাপারের জন্য নির্ধারিত ফি দিতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ইরানের এক আইনপ্রণেতা।
বুধবার (৪ নভেম্বর) ভারতের সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। এর আগে মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা আইএসএনএকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিষয়টি তুলে ধরেন দেশটির পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিটির উপপ্রধান আমির হায়াত মোগাদ্দাম।
মোগাদ্দাম বলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের ক্ষেত্রে ভারত, চীন, ইরাক ও কাতারকে বিধিনিষেধ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এসব দেশের জাহাজ নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারছে এবং যুক্তরাষ্ট্রও সেগুলোতে বাধা দিচ্ছে না।
ইরানের সঙ্গে চার দেশের পারস্পরিক স্বার্থ বিবেচনায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ভারতীয় জাহাজ চলাচলে সুবিধা দেওয়ার অন্যতম উদ্দেশ্য দেশটি থেকে ওষুধ আমদানি নিশ্চিত করা। অন্যদিকে, চীনা জাহাজকে ছাড় দেওয়ার মাধ্যমে বেইজিংয়ের রাজনৈতিক সমর্থন ধরে রাখতে চায় তেহরান।
ইরানের এই সিদ্ধান্তের পেছনে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক হিসাব রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ভারত ইরানের জন্য ওষুধের গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী। তাই ভারতীয় জাহাজ চলাচলে বাধা কমিয়ে প্রয়োজনীয় ওষুধ আমদানির পথ সচল রাখতে চায় তেহরান।
অন্যদিকে, চীনের সঙ্গে ইরানের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। চীন ইরানি তেলের অন্যতম বড় ক্রেতা। দেশটির রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থনও ইরানের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে চীনা জাহাজের চলাচল স্বাভাবিক রাখাকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে তেহরান।
কাতারের ক্ষেত্রেও রয়েছে আলাদা হিসাব। দেশটি বিশ্বের অন্যতম প্রধান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) রপ্তানিকারক। উপসাগরীয় অঞ্চলে জ্বালানি পরিবহনের জন্য হরমুজ প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইরানের আইনপ্রণেতার বক্তব্য অনুযায়ী, কাতারের জাহাজকে বিনা শুল্কে চলাচলের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
তবে ভারত ও চীনের জাহাজকে পারাপারের জন্য ফি দিতে হচ্ছে। ইরাকি জাহাজের ক্ষেত্রে কোনো শুল্ক নেওয়া হচ্ছে কি না, তা স্পষ্ট করেননি ওই আইনপ্রণেতা।
ইরানের এই সিদ্ধান্তকে হরমুজ প্রণালিতে পূর্ণাঙ্গভাবে জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়ার পদক্ষেপ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং নির্দিষ্ট চার দেশের জন্য বাছাই করা ছাড় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। অন্য দেশের জাহাজের ওপর বিধিনিষেধ বহাল থাকায় আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যে অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি।
বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেল ও জ্বালানির উল্লেখযোগ্য অংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যায়। ফলে এই জলপথে চলাচল সীমিত হলে তেল-গ্যাসের সরবরাহ, পরিবহন ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের ওপর প্রভাব পড়ে।
বিশেষ করে জ্বালানি আমদানিনির্ভর ভারতের জন্য এই ছাড় গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির অপরিশোধিত তেল, এলপিজি ও এলএনজি আমদানির বড় একটি অংশ এই নৌপথের ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে, চীন ও কাতারের জন্যও হরমুজ প্রণালি সচল থাকা অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে নির্বাচিত কয়েকটি দেশকে ছাড় দিয়ে নিজেদের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করছে ইরান। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাবও ধরে রাখতে চাইছে তেহরান।

