সাইবার ট্রাকের উৎপাদন বন্ধের পথে টেসলা

প্রত্যাশা অনুযায়ী বিক্রি না হওয়ায় বৈদ্যুতিক পিকআপ ট্রাক সাইবার ট্রাকের উৎপাদন বন্ধের পরিকল্পনা করছে মার্কিন গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলা। ২০২৭ সালের মাঝামাঝি যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস কারখানায় গাড়িটির উৎপাদন লাইন সরিয়ে নেওয়া হবে। এর পরিবর্তে চালকবিহীন ট্যাক্সি সাইবার ক্যাবের উৎপাদন বাড়াতে চায় প্রতিষ্ঠানটি।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে এ পরিকল্পনার কথা জানান টেসলার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইলন মাস্ক। তিনি জানান, সাইবার ট্রাকের উৎপাদন কমিয়ে কারখানার সক্ষমতা সাইবার ক্যাব তৈরিতে ব্যবহার করা হবে। তবে সাইবার ট্রাকের উৎপাদন অন্য কোনো কারখানায় স্থানান্তর করা হবে, নাকি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো ঘোষণা আসেনি।
পরদিন শনিবার মাস্ক আরও জানান, সাইবার ট্রাকের বকেয়া অর্ডার পূরণ করতে উৎপাদনে অতিরিক্ত একটি শিফট চালু করা হবে। তাঁর দাবি, ২০২৭ সালের জুন-জুলাইয়ে সাইবার ক্যাবের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য লাইন সরানোর আগে বর্তমান অর্ডার শেষ করতে হবে।
২০১৯ সালে প্রথমবারের মতো সাইবার ট্রাকের নকশা প্রকাশ করে টেসলা। ব্যতিক্রমী কৌণিক আকৃতি এবং স্টেইনলেস স্টিলের বাইরের কাঠামোর কারণে শুরু থেকেই গাড়িটি আলোচনায় ছিল। ২০২৩ সালের শেষ দিকে ক্রেতাদের কাছে গাড়িটির সরবরাহ শুরু হয়। সে সময় ইলন মাস্ক বছরে আড়াই লাখ সাইবার ট্রাক বিক্রির উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিলেন।
কিন্তু বাস্তবে সেই লক্ষ্য থেকে অনেক পিছিয়ে রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। গাড়ির বাজার বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান কেলি ব্লু বুকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে মাত্র ২০ হাজার ২৩৭টি সাইবার ট্রাক বিক্রি হয়েছে। অথচ ২০২৪ সালে বিক্রির পরিমাণ ছিল ৩৮ হাজার ৯৬৫টি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে গাড়িটির বিক্রি প্রায় ৪৮ শতাংশ কমেছে।
বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার পাশাপাশি সাইবার ট্রাকের গুণগত মান ও নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল হাইওয়ে ট্রাফিক সেফটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্য অনুযায়ী, বাজারে আসার পর থেকে গাড়িটি একাধিকবার রিকলের মুখে পড়েছে। বিভিন্ন ত্রুটির কারণে কিছু গাড়ি মেরামত করতে হয়েছে। আবার কয়েকটি সমস্যা সফটওয়্যার আপডেটের মাধ্যমেই সমাধান করা হয়েছে।
ইউরোপের বাজারেও সাইবার ট্রাকের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। গাড়িটির ধারালো স্টেইনলেস স্টিলের বহিরাবরণ পথচারীদের নিরাপত্তা নিয়ে ইউরোপের প্রচলিত বিধিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে সেখানে অনুমোদন পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে টেসলার ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক পরিকল্পনায় ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে সাইবার ক্যাব। সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলার উপযোগী এই গাড়িতে প্রচলিত স্টিয়ারিং হুইল, অ্যাক্সিলারেটর ও ব্রেক প্যাডেল রাখা হয়নি। চালক ছাড়াই যাত্রী পরিবহনের লক্ষ্য নিয়ে এটি তৈরি করা হয়েছে।
গত সেপ্টেম্বর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অস্টিন শহরে সীমিত পরিসরে অর্থের বিনিময়ে সাইবার ক্যাবের মাধ্যমে যাত্রী পরিবহন শুরু হয়েছে। তবে গাড়িটির নিরাপত্তাব্যবস্থা ও বাণিজ্যিক ব্যবহারের অনুমোদন নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর পর্যালোচনা চলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাইবার ট্রাকের উৎপাদন লাইন সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা টেসলার ব্যবসায়িক কৌশলে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। প্রচলিত বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদনের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবট এবং চালকবিহীন পরিবহন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ ও মনোযোগ বাড়াচ্ছে।
তবে সাইবার ক্যাবের উৎপাদন ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। ফলে সাইবার ট্রাকের জায়গা নতুন এই প্রযুক্তির গাড়ি কত দ্রুত নিতে পারবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।
সূত্র - রয়টার্স

