রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬, ২৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ asiareport24.com
বিজ্ঞাপন পুরোনো বিজ্ঞাপন #15
সংবাদ শিরোনাম

বাংলাদেশিদের মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণ ৮০ হাজার ৬২২ টাকা

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ৮ নভেম্বর ২০২৬, ১০:৩০ অপরাহ্ন আপডেট: ৮ নভেম্বর ২০২৬, ১০:৪৭ অপরাহ্ন
বাংলাদেশিদের মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণ ৮০ হাজার ৬২২ টাকা

বকেয়া ঋণ প্রায় ১৪ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা, সামনে বাড়তে পারে পরিশোধের চাপ

গত এক দশকে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ প্রায় তিন গুণ বেড়েছে। ২০১৫ সালে দেশের মোট বৈদেশিক ঋণের স্থিতি ছিল ৩ হাজার ৮৭৭ কোটি মার্কিন ডলার। ২০২৫ সালের শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ৩৪৩ কোটি ডলারে। ডলারের বিনিময়মূল্য ১২৫ টাকা হিসাবে বাংলাদেশি মুদ্রায় এই ঋণের পরিমাণ প্রায় ১৪ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে বাংলাদেশের নাগরিকদের মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬৪৬ ডলার। ২০২৪ সালের তুলনায় এক বছরে দেশের মোট বৈদেশিক ঋণ বেড়েছে ৮ দশমিক ৬ শতাংশ।

বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত ‘ইন্টারন্যাশনাল ডেট রিপোর্ট ২০২৬’-এ বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের এই চিত্র উঠে এসেছে। ১৭ কোটি ৫৭ লাখ জনসংখ্যার ভিত্তিতে মোট বৈদেশিক ঋণকে ভাগ করে মাথাপিছু ঋণের হিসাব করা হয়েছে। তবে এই পরিমাণ প্রত্যেক নাগরিকের ব্যক্তিগত ঋণ নয়; বরং দেশের মোট বৈদেশিক ঋণের একটি গড় হিসাব।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন ঋণ গ্রহণ, পুরোনো ঋণ পরিশোধ এবং অন্যান্য আর্থিক সমন্বয়ের পরও দেশের বৈদেশিক ঋণের স্থিতি বাড়ছে।

বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের বড় অংশ এসেছে বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) মতো বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর কাছ থেকে। এসব প্রতিষ্ঠানের কাছে বাংলাদেশের মোট ঋণের পরিমাণ ৫ হাজার ১১৪ কোটি ডলার। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংকের কাছে ২ হাজার ২৬৩ কোটি এবং এডিবির কাছে ১ হাজার ৭৫১ কোটি ডলার বকেয়া রয়েছে।

এ ছাড়া জাপান, চীন, ভারত ও রাশিয়ার মতো দ্বিপক্ষীয় ঋণদাতা দেশগুলোর কাছেও বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ঋণ রয়েছে। এসব দেশের কাছে মোট বকেয়া ঋণের পরিমাণ ৩ হাজার ২৬৪ কোটি ডলার।

সরকারি ঋণের পাশাপাশি বেসরকারি খাতেও বিদেশি ঋণের পরিমাণ প্রায় ১ হাজার কোটি ডলার। অন্যদিকে স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ প্রায় দেড় হাজার কোটি ডলার।

বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বাড়লেও তা পরিশোধের সক্ষমতার কয়েকটি সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান এখনো তুলনামূলকভাবে সহনীয় বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের মোট জাতীয় আয়ের (জিএনআই) তুলনায় বৈদেশিক ঋণের অনুপাত দাঁড়িয়েছে ২৪ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে এই অনুপাত বেড়েছে প্রায় ৬ শতাংশ।

তবে রপ্তানি আয়ের বিপরীতে বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধের অনুপাত কমে ১৬ শতাংশে নেমেছে। আগের বছরের তুলনায় এই হার কমেছে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। অর্থাৎ রপ্তানি থেকে প্রতি ১০০ ডলার আয়ের মধ্যে ১৬ ডলার ব্যয় হচ্ছে বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধে। এই অনুপাত কমে আসাকে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতার ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বৈদেশিক ঋণের স্থিতি বাড়ার পাশাপাশি ঋণ পরিশোধের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১২-১৩ অর্থবছরে বাংলাদেশ বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ বাবদ ১১০ কোটি ডলার পরিশোধ করেছিল।

২০২১-২২ অর্থবছরে এই পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ২০১ কোটি ডলারে। পরের অর্থবছর, অর্থাৎ ২০২২-২৩ সালে ঋণ পরিশোধের পরিমাণ প্রায় ৩০০ কোটি ডলারে পৌঁছায়।

অন্যদিকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪৫০ কোটি ডলার। ফলে ১৪ বছরের ব্যবধানে ঋণ পরিশোধের পরিমাণ বেড়েছে চার গুণেরও বেশি।

আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ, বড় কয়েকটি অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্পের ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধের সময় ঘনিয়ে আসছে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পের ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু করতে হবে। এসব প্রকল্পের ঋণের বড় একটি অংশ জাপানকে পরিশোধ করতে হবে।

অন্যদিকে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল এবং মেট্রোরেল প্রকল্পের ঋণের কিস্তি পরিশোধ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে।

সব মিলিয়ে বৈদেশিক ঋণের ক্রমবর্ধমান স্থিতি এবং ঋণ পরিশোধের বাড়তি ব্যয় বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। বিশেষ করে রপ্তানি আয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও রাজস্ব আয়ের সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ঋণ ব্যবস্থাপনা করা আগামী দিনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।