শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬, ২৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ asiareport24.com
বিজ্ঞাপন পুরোনো বিজ্ঞাপন #15
সংবাদ শিরোনাম

মানবপাচারকারীদের নির্মুলে পাহাড়ে আবারও চলছে অভিযান

অনলাইন ডেস্ক — টেকনাফ, কক্সবাজার
প্রকাশ: ৭ নভেম্বর ২০২৬, ১:০২ অপরাহ্ন
মানবপাচারকারীদের নির্মুলে পাহাড়ে আবারও চলছে অভিযান

কক্সবাজারের টেকনাফের পাহাড় যেন একের পর এক ভয়াবহ অপরাধের সাক্ষী হয়ে উঠছে। পাহাড়ের গহিনে গড়ে ওঠা মানবপাচারকারীদের গোপন আস্তানা, বন্দিশালা, জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় এবং সশস্ত্র পাহারার ভয়াবহ চিত্র সামনে আসার পর এবার অপরাধীচক্রের শিকড় উপড়ে ফেলতে বড় ধরনের অভিযান শুরু করেছে যৌথ বাহিনী। বৃহস্পতিবারের রক্তক্ষয়ী অভিযানে এক সেনাসদস্যের প্রাণহানির পরও থেমে নেই অভিযান। বরং নতুন করে তিনটি মরদেহ পড়ে থাকার তথ্য সামনে আসায় পাহাড়জুড়ে তল্লাশি আরও জোরদার করা হয়েছে।

শনিবার সকাল সাড়ে সাতটা থেকে টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের লেদা-রঙ্গীখালীর দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় এ অভিযান শুরু হয়। সেনাবাহিনীর ১০ পদাতিক ডিভিশনের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে সেনাবাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও পুলিশের দেড় শতাধিক সদস্য অংশ নেন।

যৌথ বাহিনীর লক্ষ্য, পাহাড়ের গহিনে লুকিয়ে থাকা মানবপাচারকারী চক্রের আস্তানা, গোপন বন্দিশালা এবং তাদের অপরাধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা।

এর আগে বৃহস্পতিবার একই এলাকায় যৌথ বাহিনীর অভিযানে মানবপাচারকারীদের একটি গোপন বন্দিশালা থেকে ৫৭ জনকে উদ্ধার করা হয়। এ সময় চক্রটির পাঁচ সদস্যকে আটক করা হয়। তবে অভিযান চলাকালে সশস্ত্র পাচারকারীদের সঙ্গে যৌথ বাহিনীর গোলাগুলিতে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন সেনাবাহিনীর সৈনিক মোহাম্মদ তিতাস শেখ (২৭)।

শুক্রবার সন্ধ্যায় সামরিক আনুষ্ঠানিকতা শেষে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ফরিদপুরের নগরকান্দায় নিজ গ্রামের বাড়িতে তাকে দাফন করা হয়। একজন সেনাসদস্যের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে পাহাড়ের মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানের ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

বৃহস্পতিবারের অভিযানের পর রঙ্গীখালীর পাহাড়ে আরও তিনটি মরদেহ পড়ে থাকার তথ্য সামনে এসেছে। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের একজন শহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনায় একাধিক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন বলে তিনি শুনেছেন। বন্দিশালার কাছাকাছি তিনটি মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেছেন বলেও দাবি করেছেন তিনি।

তবে মরদেহগুলো মানবপাচারকারী চক্রের সদস্যদের, নাকি বন্দিদশা থেকে পালিয়ে যাওয়া কোনো ভুক্তভোগীর, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। মরদেহগুলোর অবস্থান ও পরিচয় নিয়েও তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা।

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান বলেন, ‘রঙ্গীখালীর পাহাড়ে তিনটি মরদেহ পড়ে থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত সেখানে মরদেহ রয়েছে কি না, কিংবা সেগুলোর পরিচয় কী, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।’ বিষয়টি অনুসন্ধানে পুলিশ কাজ করছে বলেও জানান তিনি।

উদ্ধার হওয়া ৫৭ জনের বর্ণনায় উঠে এসেছে মানবপাচারকারী চক্রের প্রতারণা, নির্যাতন ও জিম্মি করে রাখার ভয়াবহ চিত্র। চাকরি কিংবা বিদেশে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন স্থান থেকে লোকজনকে এনে আটকে রাখা হতো পাহাড়ের গোপন আস্তানায়।

ভুক্তভোগী আসাদুজ্জামান জানান, চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তাকে কক্সবাজারে ডেকে আনা হয়। পরে পাহাড়ের একটি গোপন আস্তানায় আটকে রাখা হয়। সেখানে টানা আট দিন বন্দি ছিলেন তিনি। এ সময় দুইবার পালানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন।

তার ভাষ্য, বন্দিশালাটিতে ৫০ জনের বেশি মানুষকে আটকে রাখা হয়েছিল। তাদের সাগরপথে পাচারের প্রস্তুতি চলছিল। সশস্ত্র ব্যক্তিরা পাহাড়ি আস্তানাটি পাহারা দিতেন। বন্দিদের মুঠোফোনসহ ব্যক্তিগত জিনিসপত্র কেড়ে নেওয়ায় বাইরের কারও সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ ছিল না।

শুক্রবার উদ্ধার হওয়া ৫৭ জনকে টেকনাফ মডেল থানার প্রাঙ্গণে তাদের পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তাদের মধ্যে ছয়জন রোহিঙ্গা এবং ৫১ জন বাংলাদেশি।

স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীদের বর্ণনা অনুযায়ী, টেকনাফের দুর্গম পাহাড় দীর্ঘদিন ধরে মানবপাচারকারী চক্রের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। পাহাড়ের দুর্গম অবস্থান, যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা এবং সশস্ত্র পাহারার সুযোগ কাজে লাগিয়ে সেখানে গোপন আস্তানা ও বন্দিশালা গড়ে তুলেছে অপরাধীরা।

চাকরি কিংবা বিদেশে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে লোকজনকে এসব আস্তানায় এনে জিম্মি করা হয়। এরপর পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় কিংবা সাগরপথে পাচারের চেষ্টা চলে। বৃহস্পতিবারের অভিযানে ৫৭ জনকে উদ্ধারের পর তিনটি মরদেহ পড়ে থাকার তথ্য সামনে আসায় চক্রটির অপরাধের বিস্তৃতি নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান বলেন, মানবপাচারকারী চক্রের তৎপরতা সম্পূর্ণভাবে নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত যৌথ বাহিনীর অভিযান অব্যাহত থাকবে।

এক সেনাসদস্যের প্রাণহানি, ৫৭ জনের উদ্ধার, পাঁচজন পাচারকারীর আটক এবং তিনটি মরদেহের অমীমাংসিত তথ্য, সব মিলিয়ে টেকনাফের পাহাড়ে মানবপাচারকারী চক্রের ভয়াবহ নেটওয়ার্কের একাধিক দিক সামনে আসছে। শনিবারের নতুন অভিযান সেই নেটওয়ার্কের গভীরে পৌঁছাতে পারবে কি না, এখন সেদিকেই নজর স্থানীয়দের।